নকশালের নষ্টামি ও বঙ্গীয় রেনেসাঁ
গামছা থেকে যে ভাবে জল নিংড়ানো হয়, ঠিক সেইভাবে নকশাল আন্দোলন কলকাতার উদ্ভাবনী শক্তি শহরের ভিতর থেকে মুচড়ে বার করেছিল। এভাবে বলাটা কি একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে? বিন্দুমাত্র না। আসলে সুশীল সমাজের (civil society) মূলে আছে সহযোগী জীবন (associational life) মানে আমাদের জীবনের সেই ভাগটি যেটা আমরা কাটাই বিভিন্ন সভা,সমিতির, আড্ডার সদস্য হিসাবে।আবার এই সহযোগী জীবনের ভিত্তি একে অপরের প্রতি আস্থার ওপর।
ষাট দশকের কলকাতার শহুরে মাওবাদীদের প্রধান কাজই ছিল শহরের সুশীল সমাজের তছনছ করা।ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে করার, ছাত্রকে মাষ্টারমশাইয়ের পিছনে লাগানোর কারবার। মানুষের ওপর বিশ্বাস লোপ করানোর কারসাজি। চারু মজুমদারের লেখা পড়লে, নকশালবাদীদের এই কর্মসূচি সমন্ধে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। কলকাতার নকশালবাদীরা আর কিছু না করতে পারলেও কলকাতার সুশীল সমাজ বা সহযোগী জীবন পন্ড করার কাজটি কিন্তু ভালভাবে সম্পন্ন করেছিল। তার সাথে সাথেই নাশ হয়েছিল কলকাতার নতুন কিছু জানার, নতুন কিছু করার, সেই উদ্ভাবনী শক্তির।
কলকাতার নকশাল আন্দোলন কি ভাবে শহরের সৃষ্টিশীলতা ধ্বংস করেছিল তার এক উদাহরণ, সবিতেন্দ্রনাথের ‘কলেজ স্ট্রিটে সত্তর বছর‘ থেকে।
যথার্থ গবেষণার অভাবে আমাদের নির্ভর করতে হয় anecdotes অর্থাৎ লোকেদের নিজেদের গপ্প, আত্মস্মৃতির ওপর। এটা উধৃত কিশোর ঘোষালের ‘বিনি সুতোর মালা’ থেকে।
নকশালের নষ্টামি যে কি পরিমান ক্ষতি করেছে বাঙালির তা আমাদের প্রজন্মের পক্ষে বোঝা দুষ্কর। কেন ? কারন আমরা শুধু ট্রাম জ্বালানো, বাস পোড়ানো, বঙ্গীয় রেনেসাঁর প্রধান মনীষীদের প্রস্তর মূর্তি চুরমার করা, খুনখারাবি, এই সবই মনে রেখেছি। সুশীল সমাজের খুন হয়েছে নিঃশব্দে, চোখের আড়ালে। আর তার সাথেই খতম বাংলার উদ্ভাবনী শক্তি।